Home / বিবিধ / ডেঙ্গু প্রাণঘাতি কোনো রোগ নয়,বিশ্রাম ও নিয়মমাফিক চললে এই রোগ থেকে পুরোপুরি মুক্তি ।।

ডেঙ্গু প্রাণঘাতি কোনো রোগ নয়,বিশ্রাম ও নিয়মমাফিক চললে এই রোগ থেকে পুরোপুরি মুক্তি ।।

জনসচেতনতা ও প্রচারের পরামর্শক: মো: জিহাদ হোসেন-বিশিষ্ট সমাজ সেবক,দক্ষিণ বনশ্রী,খিলগাঁও-ঢাকা।

অনলাইন ডেস্ক: বর্তমান সময়ের সবচেয়ে পীড়াদায়ক রোগের একটি ডেঙ্গু।এই জ্বরে আক্রান্ত একদিকে যেমন দূর্বল হয়ে পড়ে অন্যদিকে এর রেশ শরীরে থেকে যায় দীর্ঘদিন।তবে ডেঙ্গু প্রাণঘাতি কোনো রোগ নয়।এই রোগ থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া সম্ভব বিশ্রাম ও নিয়মমাফিক চললে।

ডেঙ্গু জ্বর কী ও কিভাবে ছড়ায়:

ডেঙ্গু ভাইরাস দ্বারা ডেঙ্গু জ্বরের উৎপত্তি এবং এই ভাইরাস বাহিত এডিস ইজিপ্টাই নামক মশার কামড়ে।কোন ব্যক্তিকে ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশা কামড়ালে,৪ থেকে ৬ দিনের মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয় সেই ব্যক্তি।এবার এই আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোন জীবাণুবিহীন এডিস মশা কামড়ালে,সেই মশাটিও ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশায় পরিণত হয়।মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়িয়ে থাকে এভাবে একজন থেকে অন্যজনে।

প্রধানত দুই ধরনের হয়ে থাকে ডেঙ্গু,ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু ফিভার এবং ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার।

কখন ও কাদের বেশি হয় ডেঙ্গু জ্বর:

বিশেষ করে গরম এবং বর্ষার সময়টাতেই ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বেশি থাকে।মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত,শীতকালে এই জ্বর হয় না বললেই চলে।ডেঙ্গু মশা অনেক দিন বেঁচে থাকতে পারে শীতে লার্ভা অবস্থায়।সেগুলো থেকে নতুন করে ডেঙ্গু ভাইরাস বাহিত মশা বিস্তার লাভ করে বর্ষার শুরুতেই।

এই মশার প্রাদুর্ভাব বেশি সাধারণত শহর অঞ্চলে অভিজাত এলাকায়,বড় বড় দালান কোঠায়,তাই ডেঙ্গু জ্বরও এই এলাকার বাসিন্দাদের বেশি হয়।ডেঙ্গু কম হয় বা একেবারেই হয় না বললেই চলে বস্তিতে বা গ্রামে বসবাসরত লোকজনের।

৪ ধরনের হয়ে থাকে ডেঙ্গু ভাইরাস।তাই ডেঙ্গু জ্বরও ৪ বার হতে পারে।যারা আগেও ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে,তাদের ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে ডেঙ্গু হলে তা মারাত্মক হওয়ার ঝুঁকি থাকে।শিশুদের ক্ষেত্রে এটি বেশি দেখা যায় বিশেষ করে।

ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণসমূহ:

সাধারণত তীব্র জ্বর ও সেই সঙ্গে সারা শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা হয়ে থাকে ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বরে।১০৫ ফারেনহাইট পর্যন্ত হয়ে থাকে জ্বর।শরীরে বিশেষ করে হাড়,কোমড়,পিঠসহ অস্থি সন্ধি এবং মাংসপেশীতে তীব্র ব্যথা হয়।এছাড়া মাথাব্যথা ও চোখের পিছনে ব্যথা হয়।অনেক সময় ব্যথা এত তীব্র হয় যে মনে হয় বুঝি হাড় ভেঙ্গে যাচ্ছে। তাই এই জ্বরের আরেক নাম “ব্রেক বোন ফিভার”।

সারা শরীরজুড়ে লালচে দানা দেখা যায় জ্বর হওয়ার ৪ বা ৫ দিনের সময়,যাকে বলা হয় স্কিন র‌্যাশ,অনেকটা এলার্জি বা ঘামাচির মতো।এর সঙ্গে বমি বমি ভাব,এমনকি বমি হতে পারে।রোগী অতিরিক্ত ক্লান্তিবোধ করে এবং রুচি কমে যায়। সাধারণত ৪ বা ৫ দিন জ্বর থাকার পর তা এমনিতেই চলে যায় এবং কোন কোন রোগীর ক্ষেত্রে এর ২ বা ৩ দিন পর আবার জ্বর আসে।একে “বাই ফেজিক ফিভার”বলে।

ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বর:

এই অবস্থাটাই সবচেয়ে জটিল।এই জ্বরে ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ও উপসর্গের পাশাপাশি আরো যে সমস্যাগুলো হয়,তা হল-

রক্ত পড়া শুরু হয় শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে,যেমন চামড়ার নিচে,নাক ও মুখ দিয়ে,মাড়ি ও দাঁত হতে,কফের সঙ্গে, রক্তবমি,পায়খানার সাথে তাজা রক্ত বা কালো পায়খানা,চোখের মধ্যে এবং চোখের বাহিরে,মহিলাদের বেলায় অসময়ে ঋতুস্রাব অথবা রক্তক্ষরণ শুরু হলে অনেকদিন পর্যন্ত রক্ত পড়তে থাকা ইত্যাদি।

এই রোগের বেলায় অনেক সময় বুকে পানি,পেটে পানি ইত্যাদি দেখা দিতে পারে।অনেক সময় লিভার আক্রান্ত হয়ে রোগীর জন্ডিস,কিডনীতে আক্রান্ত হয়ে রেনাল ফেইলিউর ইত্যাদি জটিলতা দেখা দিতে পারে।

ডেঙ্গু শক সিনড্রোম:

ডেঙ্গু জ্বরের ভয়াবহ রূপ হল ডেঙ্গু শক সিনড্রোম।ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারের সাথে সার্কুলেটরী ফেইলিউর হয়ে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম হয়।এর লক্ষণ হল:

 রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া।

নাড়ীর স্পন্দন অত্যন্ত ক্ষীণ ও দ্রুত হয়।

শরীরের হাত পা ও অন্যান্য অংশ ঠাণ্ডা হয়ে যায়।

প্রস্রাব কমে যায়।

হঠাৎ করে রোগী জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে পারে। এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

কখন ডাক্তার দেখাবেন:

নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই ডেঙ্গু জ্বরের।তবে এই জ্বর সাধারণত নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়।তাই উপসর্গ অনুযায়ী সাধারণ চিকিৎসাই যথেষ্ট।ডাক্তারের পরামর্শ নেয়াই ভালো কিছু কিছু ক্ষেত্রে-

শরীরের যে কোন অংশ থেকে রক্তপাত হলে।

প্লাটিলেটের মাত্রা কমে গেলে।

শ্বাসকষ্ট হলে বা পেট ফুলে পানি আসলে।

প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেলে।

জন্ডিস দেখা দিলে।

অতিরিক্ত ক্লান্তি বা দুর্বলতা দেখা দিলে।

প্রচণ্ড পেটে ব্যথা বা বমি হলে।

কী কী পরীক্ষা করা উচিত:

আসলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডেঙ্গু জ্বর হলে খুব বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার দরকার নাই,এতে অযথা অর্থের অপচয় হয়।

সিবিসি এবং প্লাটিলেট করাই যথেষ্ট জ্বরের ৪-৫ দিন পরে।এর আগে করলে রিপোর্ট স্বাভাবিক থাকে এবং অনেকে বিভ্রান্তিতে পড়তে পারেন।প্লাটিলেট কাউন্ট ১ লক্ষের কম হলে,পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া উচিত ডেঙ্গু ভাইরাসের কথা মাথায় রেখে।

৫ বা ৬ দিনের পর করা যেতে পারে ডেঙ্গু এন্টিবডির পরীক্ষা।এই পরীক্ষা রোগ সনাক্তকরণে সাহায্য করলেও রোগের চিকিৎসায় এর কোন ভূমিকা নেই।এই পরীক্ষা না করলেও কোন সমস্যা নাই,এতে শুধু শুধু অর্থের অপচয় হয়।

প্রয়োজনে ব্লাড সুগার,লিভারের পরীক্ষাসমূহ যেমন এসজিপিটি,এসজিওটি,এলকালাইন ফসফাটেজ ইত্যাদি করা যাবে।

এছাড়াও প্রয়োজনে পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম,বুকের এক্সরে ইত্যাদি করা যাবে।

চিকিৎসক যদি মনে করেন যে রোগী ডিআইসি জাতীয় জটিলতায় আক্রান্ত,সেক্ষেত্রে প্রোথ্রোম্বিন টাইম,এপিটিটি,ডি-ডাইমার ইত্যাদি পরীক্ষা করতে পারেন।

ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা কী করতে হবে:

সাধারণত ৫ থেকে ১০ দিনের মধ্যে নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত বেশির ভাগ রোগী,এমনকি কোনো চিকিৎসা না করালেও।তবে রোগীকে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েই চলতে হবে,যাতে ডেঙ্গু জনিত কোনো মারাত্মক জটিলতা না হয়।ডেঙ্গু জ্বরটা আসলে একটা গোলমেলে রোগ,চিকিৎসা দিতে হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লক্ষণ অনুযায়ী।

সম্পূর্ণ ভালো না হওয়া পর্যন্ত বিশ্রামে থাকতে হবে।

যথেষ্ট পরিমাণে পানি,শরবত,ডাবের পানি ও অন্যান্য তরল জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে।

 খেতে না পারলে দরকার হলে শিরাপথে স্যালাইন দেওয়া যেতে পারে।

জ্বর কমানোর জন্য শুধুমাত্র প্যারাসিটামল জাতীয় ঔষধই যথেষ্ট।এসপিরিন বা ডাইক্লোফেনাক জাতীয় ব্যথার ঔষধ কোনক্রমেই খাওয়া যাবে না।এতে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়বে।

জ্বর কমানোর জন্য ভেজা কাপড় দিয়ে গা মোছাতে হবে।

ডেঙ্গু জ্বর কিভাবে প্রতিরোধ করা যায়:

ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধের মূল মন্ত্রই হল এডিস মশার বিস্তার রোধ এবং এই মশা যেন কামড়াতে না পারে,তার ব্যবস্থা করা।মনে রাখতে হবে,এডিস একটি ভদ্র মশা,অভিজাত এলাকায় বড় বড় সুন্দর সুন্দর দালান কোঠায় এরা বাস করে।স্বচ্ছ পরিষ্কার পানিতে এই মশা ডিম পাড়ে।ময়লা দুর্গন্ধযুক্ত ড্রেনের পানি এদের পছন্দসই নয়।তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার ডিম পাড়ার উপযোগী স্থানগুলোকে পরিষ্কার রাখতে হবে এবং প্রযোজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে একই সাথে মশক নিধনের জন্য।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড়,জঙ্গল,জলাশয় ইত্যাদি।

যেহেতু এডিস মশা মূলত এমন বস্তুর মধ্যে ডিম পাড়ে যেখানে স্বচ্ছ পানি জমে থাকে,তাই ফুলদানি,অব্যবহৃত কৌটা,ডাবের খোসা,পরিত্যক্ত টায়ার ইত্যাদি সরিয়ে ফেলতে হবে।ব্যবহৃত জিনিস যেমন মুখ খোলা পানির ট্যাংক,ফুলের টব ইত্যাদিতে যেন পানি জমে না থাকে,সে ব্যবস্থা করতে হবে।

ঘরের বাথরুমে কোথাও জমানো পানি ৫ দিনের বেশি যেন না থাকে।একুরিয়াম,ফ্রিজ বা এয়ার কন্ডিশনারের নিচেও যেন পানি জমে না থাকে।

সাধারণত সকাল ও সন্ধ্যায় কামড়ায় এডিস মশা।তবে অন্য সময়ও কামড়াতে পারে।তাই দিনের বেলা শরীর ভালোভাবে কাপড়ে ঢেকে বের হতে হবে,প্রয়োজনে মসকুইটো রিপেলেন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে।নেট লাগাতে হবে ঘরের চারদিকে দরজা জানালায়।

মশারি টাঙিয়ে অথবা কয়েল জ্বালিয়ে ঘুমাতে হবে দিনে ঘুমালে।

বাচ্চাদের যারা স্কুলে যায়,তাদের হাফপ্যান্ট না পরিয়ে ফুল প্যান্ট বা পায়জামা পরিয়ে স্কুলে পাঠাতে হবে।

অবশ্যই সব সময় মশারির মধ্যে রাখতে হবে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে,যাতে করে রোগীকে কোন মশা কামড়াতে না পারে। স্প্রে,কয়েল,ম্যাট ব্যবহারের সাথে সাথে মশার কামড় থেকে বাঁচার জন্য দিনে ও রাতে মশারী ব্যবহার করতে হবে মশক নিধনের জন্য।

হয়ত বা নির্মূল করা যাবে না ডেঙ্গু জ্বর।এর কোন ভ্যাক্সিনও বের হয় নাই,কোন কার্যকরী ঔষধও আবিস্কৃত হয় নাই।ডেঙ্গু জ্বরের মশাটি আমাদের দেশে আগেও ছিল,এখনও আছে,মশা প্রজননের এবং বংশবৃদ্ধির পরিবেশও আছে।তাই ডেঙ্গু জ্বর ভবিষ্যতেও থাকবে।এর হাত থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব একমাত্র সচেতনতা ও প্রতিরোধের মাধ্যমেই।

(বি:দ্র তথ্য সংগ্রহকরা)

About admin

Check Also

হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক গ্রেফতার-সারা দেশে কঠোর সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে পুলিশ।।

অনলাইন ডেস্ক :    ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগ হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *