Home / বিবিধ / স্মৃতিতে মরহুম মুন্সী আজিজুল হক সাহেব।।

স্মৃতিতে মরহুম মুন্সী আজিজুল হক সাহেব।।

লেখক: নুরে জালাল উজ্জ্বল-গাজিপুর।

অনলাইন ডেস্ক :     আজ আমি যার কথা বলব – শুধু নওপাড়া নয়… নওপাড়া_ সীমানা_ পেড়িয়ে_ জনপ্রিয়তায় তিনি শীর্ষে চলে গিয়েছিলেন বহুদুর।

যদিও মানুষটি আজ আমাদের মাঝে নেই কিন্তু তার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে শরীয়তপুরবাসির মাঝে। বার বার মনে পড়ে সেইসব স্মতিৃগুলোর কথা। সবকিছু দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। বেশির ভাগই শুনেছি কিছুটা দেখেছি।

আপনার আমার অতি প্রিয় ভালোবাসার মানুষ। তিনি হচ্ছেন নওপাড়া চরআএার ঐতিয্যবাহী মুন্সী পরিবারের কৃতি সন্তান মরহুম মুন্সী আজিজুল হক সাহেব। যার নামটি সর্বএ এবং সর্বোচ্চ ব্যপকভাবে পরিচিতি পেয়েছিল।

আজও নড়িয়া উপজিলার সমগ্র মানুষ তার নামটা শুনলে সম্মান আর শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখে। একটা সময় আমরাও অনেকেই নওপাড়া না বলে উপজিলার দেশের মানুষ বলে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দবোধ করতাম।

জনাব মুন্সী আজিজুল হকের নামের উপর মানুষ আমাদের যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন করতেন। শুধু নওপাড়া নয় নড়িয়,শরীয়তপুর, চাঁদপুর ও মুন্সীগন্জ্ঞ সর্বএই তার নামটি সুপরিচিত ছিল।

মানুষের কর্মই মানুষের নাম বড় করে তোলে। আর সেই নামের উপর মানুষের চলার পথ সুগম করে দেয়।

বাস্তব একটা উদাহরন তুলে ধরছি বোঝার স্বার্থে – মাস্তান ভাই যখন পিজিআর এ ছিল তখন আমি তার কাছে দেখা করার জন্য যাই। গেটে যেতেই আমার পরিচয় জানতে চাইল। আমি সরাসরি বলেই ফেললাম মেজর মাস্তান সফিউল্যাহ আমার ভাই। নামটা বলা মাএই একজন সিপাহী আমাকে গার্ড অব অর্নার এর মতই মেজরের গেষ্ট রুমে নিয়ে গেল। তারপর অনেক অতিথি আপ্যায়ন। মাস্তান ভাই আসার পর একই কায়দায় এক সিপাহী মাস্তান ভাইয়ের রুমে নিয়ে গেল। মনে মনে ভাবলাম নাম আর পদবী বলেই আজ এত সম্মান পেলাম।

ঠিক মুন্সী আজিজুল হক সাহেব যখন উপজিলার চেয়ারম্যান ছিলেন মানুষ আমাদের যে সম্মান দিয়েছিল আজও সেই সম্মান বয়ে বেড়াচ্ছি। তার ক্ষমতা আর দাপটের সুফল ভোগ করেছে আমাদের অএ এলাকার বড় ভাইয়েরা।

দেখেছি নড়িয়ার বুকে তারা বুক ফুলিয়ে চলেছে। সবই মুন্সী আজিজুল হকের অবদান ছিল। মুন্সী আজিজুল হকের এত জনপ্রিয়তার মুল কারন ছিল তিনি একজন উদার মনের মানুষ ছিলেন। এতটাই উদার ছিল যা আকাশের মতই বিশাল, সাগরের মতই গভীর, হিমালয়ের মত এই মানুষটি সারাজীবন নদীর স্রোতের মতই মানুষকে ভালোবাসা দিয়ে গেছেন।

তার মধ্যে বিন্দু পরিমান রাগ,হিংসে ও অহংকার ছিল না। কাউকে কোনদিন ধমক দিয়ে কথা বলতেন না। মানুষটি অত্যান্ত ধৈর্য্যশীল ছিলেন। তিনি ছিলেন নম্র,ভদ্র স্বদালাপি ও হাস্যোউজ্জল একজন মানুষ। মানুষের মন জয় করার আলাদা একটা গুন ছিল। যে কোন পরিস্থিতি পাল্টে দেওয়ার দারুন ক্ষমতা ছিল তার।

তার বাড়িটা ছিল মানুষের জন্য উন্মুক্ত। রাতদিন চব্বিশ ঘন্টাই মানুষের যাতায়াত ছিল। সবসময়ই মানুষের ভিড় লেগেই থাকত। তিনি কখনও বিরক্ত হতেন না। মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন।

 এমনও দেখেছি শুধু বাড়ির উঠোন নয় ঘরের বারেন্দা পেরিয়ে ড্রইং রুম,ডাইনিং রুম ও বেডরুম পর্যন্ত মানুষ কথা বলার জন্য পৌছে যেতেন। তাতেও রাগ করতেন না। বলত মানুষ আমাকে ভালোবাসে বলেই ত আজ আমি আজিজুল মুন্সী।

তারাই আমাকে সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌছে দিয়েেছে। আমি তাদের কথা শুনব না কাদের কথা শুনব ?

জনগনই আমার সকল ক্ষমতার উৎস। অতিথি আপ্যায়নের ক্ষেএেও তিনি কখনও ক্রটি করেন নাই। তার বাড়িতে দশ বারো জন লোক থাকত শুধু বাড়ির কাজের জন্য। সারাদিন রান্নার কাজেই ব্যাস্ত থাকত সবাই। খানাপিনা ছিল চট্রগ্রামের গরীবুল্লাহ শাহ মাজারের মতই উন্মুক্ত। যে কেউই আসত কিছু না কিছু খেয়ে যেতেই হত।

সুরেস্বর নিবাসী জনাব হাসান আলীর কাছ থেকে শুনেছি – আপনাদের উপজিলার চেয়ারম্যানের বাড়ি আমি যতদিন গেছি কোনদিন সে আমাকে না খেয়ে আসতে দেয়নি। সত্যি সে একজন অসাধারন মানুষ। আমি তাকে নানা বলতাম। তাই সেদিন আমিও একটু হেসেই বলেছি নানা আপনার মত অনেক হাসান আলীরাই প্রতিদিন আসছে আর মেহমানদারি করছে। এরকম হাজারো গল্পের জন্ম দিয়ে গেছেন তিনি। বলেও শেষ করা যাবে না।

দু একটা গল্প বলব আমি। নড়িয়া কলেজে পড়ার সুবাদে আমি দীর্ঘ্যদিন নড়িয়ায় ছিলাম। প্রতিদিন বিকেল বেলায় আড্ডা দিতাম নড়িয়া উপজিলা পরিষদের সামনে। মাঝে মাঝে কাকা মতি ড্রাইভারের দোকানেও বসতাম। একদিন এক ভদ্রলোক তার দোকানে আসল। বসে গল্প করার ফাকে বলল আজিজুল মুন্সী কেমন আছে ? মতি কাকা বলল ভালো আছে। লোকটি বলল – আমি শুধু উনার সাথে দেখা করার জন্যই ওনার ছেলের বিয়েতে যাই। আমি উপজিলা পরিষদে চাকরী করায় অনেক ইউনিয়নে গেছি। কিন্তু আজিজুল মুন্সীর মত কেউ নয়। তিনি নামও আজিজুল মুন্সী কামেও আজিজুল। তিনি নিজে খেতে ভালোবাসতেন মানুষকে খাওয়াতেও ভালোবাসতেন। তিনি যা আনতেন তার চেয়েও বেশি মানুষকে খাওয়াতেন। তার এলাকায় কাজের জন্য আমরা যত কর্মকর্তা যেতাম নদীর বড় ফাঙ্গাস মাছ ও খাসির মাংস খাওয়াত। তিনি একজন বড় দিলের মানুষ। সেই লোকটার কথাশুনে সত্যি গর্বে বুকটা ভরে গিয়েছিল । সম্পা ফুফুর পেইজে পেয়েছি। অবশ্য তার কাছে জনৈক এক ব্যক্তি এই তথ্যটা দিয়েেছে।

মুন্সী আজিজুল হক যখন ওয়াপদা হয়ে নড়িয়ায় যেতেন তখন মুলফৎগন্জ ব্রিজের উপর অনেকগুলো রিক্সা তার জন্য অপেক্ষা করতেন, মুন্সী আজিজুল হকের সাথে অনেক লোকও থাকত। উনি এক রিক্সায় উঠত বাকিরা অন্য রিক্সায় উঠার পরও যারা থাকত তাদেরকে বলত তোমরাও চলে আস। নড়িয়ায় গিয়ে স্যার আমাদের সবাইকে ভাড়া দিয়ে দিতেন। আমরা আজও স্যারকে মিস করি।

গল্পের পর গল্প তৈরি করে গেছেন মরহুম মুন্সী আজিজুল হক সাহেব। বলেও শেষ করা যাবে না।

আমার জীবন থেকে আর একটা গল্প বলে শেষ করব। ৮৯ সাল। আমি ক্লাস ফাইবে বৃত্তি পরীক্ষা দেই। আমার বন্ধু সেলিমও ছিল। তখনও মুন্সী আজিজুল হক উপজিলার চেয়ারম্যান। আমরা উনার নড়িয়ার বাসার নীচ তলায় ছিলাম। সাথে আমাদের লতিফ স্যারও ছিল। পরদিন পরীক্ষা দিতে যাই। হাজার হাজার লোকের ভিড় দেখে অনেকটা ভয় পেয়ে যাই। হলে ঢুকলাম। সবাই চলে গেল। ভয়টা আরোও বেড়ে গেল। তার উপর ম্যাজিস্ট্রেট নামক আতংক। প্রশ্ন পেয়ে লিখা শুরু করতেই উপজিলার চেয়ারম্যান মুন্সী আজিজুল হক ও মোস্তফা স্যারসহ ম্যাজিস্ট্রেট হলে প্রবেশ করল। চেয়ারম্যান সাহেব প্রথমেই বলল আমার ছেলেরা কই ? মোস্তফা স্যার আমাদের দেখিয়ে দিলেন। চেয়ারম্যান সাহেব কাছে এসে হাত বুলিয়ে দিলেন। ভয় কর না। ভালো করে পরীক্ষা দাও। আমি আছি…।

মুহুর্তের মধ্যে সমস্ত ভয় চলে গেল। সত্যি আপনার তুলনা শুধু আপনিই। কারোর সাথে নয়। তিনি অত্যান্ত শিক্ষানুরাগীও ছিলেন। তাই নওপাড়া ভবিষ্যত প্রজন্মের কথাভেবে আজকে নওপাড়া পাবলিক হাইস্কুলটি তিনিই প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। তারই সুফল ভোগ করছে আমাদের এলাকার ছেলে মেয়েরা।

আপনার এই অবদানের কথা ভুলব না কোনদিন। আপনি নিজের জন্য কিছুই রেখে যাননি। রেখে গেছেন আপনার সুযোগ্য সন্তানদের। তারাই আজ আপনার অসমাপ্ত কাজ বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে কাজ করছে। নওপাড়াবাসিও আপনার সন্তানদেরকে ভালাোবাসা দিয়ে আপনার মতই বুকে আগলে রেখেছে।

আপনার মতই তারা মানুষের ভালোবাসা ও মন জয় করতে পেরেছে। আগামী দিনগুলোতে যেন তারা মানুষের পাশে থেকে জনসেবা মুলক কাজ করতে পারে সেই প্রত্যাশা রাখি আমরা সকল নওপাড়াবাসি।

আর আপনার জন্য নওপাড়াবাসির পক্ষ থেকে দোয়া রইল আল্লাহ যেন আপনাকে বেহেশত নসিব করেন। আমিন। আমার লেখায় ভুল হতে পারে তার জন্য সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে বিদায় নিলাম। আল্লাহ হাফেজ।

About admin

Check Also

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের আবেদন যেভাবে করবেন।।

অনলাইন ডেস্ক :     গত মাসে প্রকাশিত হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) অধীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *